৬ জুলাই ২০২৪। সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী ছাত্র-তরুণদের দাবি অবশ্যই ন্যায্য এবং যৌক্তিক বলে মনে করে বিএনপি। চলমান এ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে দলটি। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ‘প্রত্যয়’ স্কিম প্রত্যাহারের দাবির প্রতি সমর্থন জানায়। দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, “সর্বজনীন পেনশন ‘প্রত্যয়’ স্কিম প্রত্যাহারের দাবিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও কর্মচারীদের এই যৌক্তিক আন্দোলন সমর্থন করছি এবং অবিলম্বে এ পেনশন স্কিম প্রত্যাহারের আহ্বান জানাচ্ছি।”
তিনি বলেন, “আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি দেশের সব কয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারী সম্প্রতি শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন। সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করার জন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের সম্পৃক্ত করে সরকার পরিপত্র জারি করেছে। এ বিষয়টি নিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীবৃন্দ এই স্মারক প্রত্যাখ্যান করে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা দান, পরীক্ষা গ্রহণসহ সব ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ রয়েছে। এতে করে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এটা জাতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রকৃত পক্ষে এটি এই দেউলিয়া সরকারের দুর্নীতির আর একটি পথ খুলে দেওয়া। যেহেতু দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চরম সংকটাপন্ন এবং অন্যান্য খাতসহ শিক্ষকদের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে এই পেনশনের টাকা তুলে নিতে চাচ্ছে বলে দাবি করেন।”
তিনি বলেন, “সরকারের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বলতাকে পুঁজি করে শাসক গোষ্ঠীর আশীর্বাদপুষ্ট এক শ্রেণির ব্যবসায়িক লুটেরা সিন্ডিকেট ও কিছু কিছু সরকারি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারীরা সীমাহীন লুটপাট করছে। ব্যাংকসহ সব আর্থিক খাত সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে তারা বিদেশে অর্থ পাচার করছে। সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নিচ্ছে না।”
বিএনপি মহাসচিব বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও কর্মচারীদের এই যৌক্তিক আন্দোলন সমর্থন করছি। কোটাবিরোধী আন্দোলনে সমর্থন রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রীয় আচার অনুষ্ঠানে, এমনকি তাদের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মানের সাথে দাফন সম্পন্ন করা হয়। এগুলো তাদের প্রাপ্য।”
এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতাসহ নানান সুবিধা আছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান অঙ্গীকার ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণ করা। সাংবিধানিকভাবে ও আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান। কিন্তু সংবিধানের ২৮ (৪) এবং ২৯ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নারী ও নাগরিকদের পিছিয়ে পড়া অংশ এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও শারীরিক প্রতিবন্ধীর বাইরে ব্যতিক্রম হিসেবে কিছু সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।”
৫৬ শতাংশ কোটা ব্যবস্থা বহাল রেখে প্রযুক্তি ও মেধা নির্ভর বিশ্ব ব্যবস্থায় জাতি হিসেবে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি বা কোনো শ্রেণিতেই কোটা পদ্ধতি মেধা বিকাশে সহায়ক হতে পারে না। মেধাভিত্তিক বৈষম্যহীন জাতি ও সমাজ বিনির্মাণের মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।”
বর্তমান অবৈধ ও অনির্বাচিত সরকার বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে অর্থাৎ আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জনগণের ন্যায্য দাবিসমূহ দমিয়ে রাখার ঘৃণা পুরোনো কৌশলেই তারা ছাত্রসমাজের ন্যায্য আন্দোলনকে দমানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে বলেও যোগ করেন মির্জা ফখরুল।
তিনি বলেন, “আইন ও বিচার বিভাগের দোহাই দিয়ে ছাত্র সমাজের যৌক্তিক দাবিগুলো দমানোর সব অপচেষ্টাই ব্যর্থ হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে জনগণের ন্যায়সংগত আন্দোলন কখনোই দমানো যায় না। আমরা আশা করি সরকার সময় থাকতে ছাত্রসমাজের যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবিসমূহ মেনে নেবে।”
তিনি ছাত্রদের ন্যায় সংগত যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে এই সমস্যা সমাধানের জন্য আহ্বান জানান।
খুলনার শিববাড়িতে সড়ক অবরোধ : সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কার ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিতের দাবিতে মহানগরীতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ৬ জুলাই বিকেল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল সহকারে নগরীর শিববাড়ি মোড়ে অবস্থান নেয়।
এসময় শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিতে থাকে। পরে নগরীর শিববাড়ি মোড়ে সড়ক অবরোধ করে। শিক্ষার্থীরা সন্ধ্যা পৌনে ৭টা পর্যন্ত শিববাড়ি মোড়ে সড়ক অবরোধ করে রাখে। এতে খুলনা-যশোর মহাসড়ক, শিববাড়ি-সোনাডাঙ্গা সড়ক ও শিববাড়ি-ময়লাপোতা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় যানজটের।
খুবির বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আবির হাসান বলেন, “এ রায় অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখব।”
খুবি শিক্ষার্থী আজাদ মিয়া বলেন, “কোটা বাতিলের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে। সাংবিধানিক দাবি আদায়ে রাজপথে নেমে এসেছি। আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব। চার দফা দাবিতে তারা আন্দোলন অব্যাহত রাখে।”
কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ ইবি শিক্ষার্থীদের : ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করে। অবরোধের ফলে সড়কের দু’পাশে কয়েক কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়।
দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক সংলগ্ন কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে। অবরোধ চলাকালে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা এ সময় বৃষ্টি উপেক্ষা করে অবরোধ চালিয়ে যায়। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়ক ছেড়ে দেয়।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ ভবনসংলগ্ন বটতলা থেকে পদযাত্রা শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। তারা ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক হয়ে কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক দিয়ে ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী শেখপাড়া বাজার প্রদক্ষিণ করে আবারও প্রধান ফটকে আসে।
এ সময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ফটকসংলগ্ন মহাসড়কে বসে পড়েন। এতে দু’পাশের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় বৃষ্টি শুরু হলেও শিক্ষার্থীরা অবরোধ চলমান রাখেন। প্রায় আধা ঘণ্টা অবরোধের পর সড়ক ছেড়ে দেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’, ‘সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’ ‘মেধাবীদের কান্না, আর না আর না’ সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। শিক্ষার্থীরা বলেন, “সরকারি চাকরিতে বর্তমান কোটা পদ্ধতির ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। চাকরির ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ কোটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এই কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কার চাই। সারা দেশের ছাত্রসমাজ মাঠে নেমেছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরব না।”
বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ : প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে আপিল বিভাগ। এর প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলন ও সড়ক অবরোধ করে গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ৬ জুলাই বিকেল ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এসময় মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়া সড়কের বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
এসময় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। ‘জ্বালো রে জ্বালো, আগুন জ্বালো’ ‘কোটা বৈষম্য নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক’, ‘মেধাবীদের যাচাই কর, কোটা পদ্ধতি বাতিল কর’, ‘আঠারোর হাতিয়ার, গর্জে ওঠো আরেকবার’, ‘জেগেছে রে জেগেছে, ছাত্রসমাজ জেগেছে’, ‘বাতিল চাই বাতিল চাই, কোটা প্রথা বাতিল চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকে।
এসময় শিক্ষার্থীরা কোটা বাতিলের দাবি না মানা হলে কঠোর আন্দোলন চালিয়ে যাবার পাশাপাশি ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয়। পরে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে অবরোধ তুলে নেয়। অবরোধ চলাকালে গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়া সড়কের দু’পাশে বেশ কিছু যানবাহন আটকা পড়ে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ক্লাস, পরীক্ষা বর্জন, ছাত্র ধর্মঘট এবং দেশের সকল সড়ক, মহাসড়কে অবরোধের ডাক দেয়। এ কর্মসূচিকে নামকরণ করা হয় ‘বাংলা ব্লকেড’ (কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, সেপ্টেম্বর ২০২৪)।
খুলনা গেজেট/এনএম

